| |

Ad

বিনা উদ্ভাবিত জীবানু সার

আপডেটঃ 6:05 pm | June 29, 2021

মোঃ আব্দুল হাফিজ ঃ বাংলাদেশ পরমানু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) দেশের কৃষির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখছে। ফসলের বিভিন্ন জাত আবিষ্কার সহ নাট্রোজেন সারের বিকল্প হিসেবে লিগিউম জাতীয় ফসলের জন্য ৯টি জীবানু সার উদ্ভাবন করেছে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বৈঞ্জানিক বিনার মহা-পরিচালক ড. মির্জা মো মোফাজ্জল ইসলাম, বরেন্য খ্যতিমান বৈঞ্জানিক বিনার পরিচালক প্রশাসন ও সাপোর্ট সার্ভিস ড. মো আবুল কালাম আজাদ, প্রধান বৈঞ্জানিক কর্মকর্তা খ্যতিমান বৈঞ্জানিক যথাক্রমে ড. মো শহীদুল ইসলাম ও ড. মো রফিকুল ইসলামের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিনা উদ্ভাবিত জীবানু সারের সংক্ষিপ্ত বর্ননা তুলে ধরা হলো। জীবানু সার কি: মাটিতে উদ্ভিদের জন্য অত্যাবশকীয় মৌলিক উপাদানসমূহের অভাব ঘটলে কৃত্তিমভাবে তৈরি করে মৌলিক উপাদান প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়।

ফসলের পুষ্টি উপাদানসমূহের ঘাটতি পূরণে যে সব দ্রব্য প্রয়োগ করা হয় সেগুলোকে সার বলা হয়। জীবানু যখন সার হিসাবে ব্যবহার করা হয় কথন তাবে জীবানু সার বলা হয়। অন্য কথায় জীবানু যখন মাটিতে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি মেটানোর জন্য নিমিত্ত ব্যবহার করা হয় তখন তাকে জীবানু সার বলা হয়। জীবানুর বিস্তার প্রকৃতির সর্বত্র। মাটি, পানি ও বাতাসে কোন না কোন ভাবে এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে মৃত্তিকায় এদের সংখ্যা প্রচুর। আমাদের কৃষি জমিতে বিভন্ন ধরনের ক্ষুদ্র জীবানু পাওয়া যায়, যা গাছের খাদ্য সরবরাহ করে ফলে উৎপাদনে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখে।

ঐসব আণুবীক্ষনিক ক্ষুদ্র জীবানুকে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে মাটি বা ফসলের উপযোগী করে বাছাই করা হয় এবং বাছাইকৃত জীবানুগুলোকে ল্যাবরেটরীতে বা কারখানায় বিশেষ পদ্বতি অনুসরন করে জীবানু সার তৈরি করা হয়। বিনা বিভিন্ন ফসলের ৯টি জীবানু সার উদ্ভারন করেছে। জীবানু সারের প্রযোজনীয়তা: জীবানু সার প্রকৃতি থেকে পৃথকৃত জীবানুদ্বারা উৎপাদিত হয় বলে পরিবেশের উপর কোন বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় না, ফলে পরিবেশ দূষণমুক্ত থাকে। সাধারণত: গাছের বৃদ্ধির জন্য সত্যপীর অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান প্রয়োজন তাদের মধ্যে একজন অন্যতম।

বায়ুমন্ডলের প্রায় ৭৭.১৬% নাইট্রোজেন থাকলেও উদ্ভিদ বা প্রাণী। সাধারণত: ঐ বায়ুর নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে না। পরিমাণগত নাইট্রোজেন সরবরাহ পেলে কাজ ঘন সবুজ ওরা রসালো হয়। নাইট্রোজেনের অভাবে গাছ বেটে, হলুদ বর্নের ও কম শিকড়যুক্ত হয় এবং বাহ্যিক ভাবে অপুষ্টির লক্ষণ প্রদর্শন করে পৃথিবীর প্রায় সকল মাটিতে নাইট্রোজেনের অভাব পরিলক্ষিত হয়।

বাংলাদেশের মাটিতে এবং এর অভাব আরও প্রকট। মাটির এ ঘাটতি পূরণে ইউরিয়া বা অ্যামোনিয়াম সালফেট সার ব্যবহার করা হয়। শিল্প-কারখানায় শার্ট দুটি তৈরি করতে প্রচুর শক্তি (২০০-৩০০ অ্যাটমোসফিয়ার) তাপমাত্রা (৪৫০-৫০০ সে.) এবং অর্থ ব্যয় হয়।

আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ডাল একটি অতি প্রয়োজনীযয় খাদ্য। কিন্তু আমিষ সমৃদ্ধ, সুস্বাদু ও সুপ্রাচ্য খাদ্যবস্তুটি খাদ্য তালিকা থেকে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে কারণ চাহিদার তুলনায় আমাদের দেশের ডাল ফসলের উৎপাদন হেক্টরপ্রতি বেশ কম। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে কিন্তু সে অনুপাতে চাষের জমির পরিমাণ বাড়ানো যাচ্ছে না বরং কমছে। চাহিদার তুলনায় ডালের উৎপাদন কম বিধায় প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ দেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

অতএব, ডালের উৎপাদন বাড়ানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে হেক্টরপ্রতি ফলন বাড়ানো। সে ক্ষেত্রে আধুনিক চাষ পদ্ধতি, উচ্চ ফলনশীল জাত ও জীবানু সারের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব। ডাল ও তৈল (সয়াবিন ও -চিনাবাদাম) শস্য ব্যবহৃত রাইজোবিয়াম/ ব্রাডিরাইজোবিয়াম জীবাণু সার অনুকূল পরিবেশে হেক্টরপতি ৫০-৩০০ কেজি নাইট্রোজেন বাতাস থেকে সংগ্রহ করতে সক্ষম। পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, বিভিন্ন ঋতুর প্রভাবে বাংলাদেশের মাটিতে বিদ্যমান রাইজোবিয়াম/ব্রাডিরাইসরিয়া জীবানুর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কমে যায়।

অতএব প্রত্যেক মৌসুমী ডাল ও তৈল জাতীয় ফসল চাষের সময় জীবাণু সার ব্যবহার করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। আমাদের দেশে ডাল ও তৈল জাতীয় শস্য জীবাণু সার ব্যবহারের উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশের পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত জীবাণু সার (রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া যা পিট মাটিতে মেশানো) কৃষকের মাঝে সরবরাহ করা হচ্ছে।

৯টি ডাল ও শিম জাতীয় শস্যের (মসুর,ছোলা,মুগ,বরবাটি,চীনাবাদাম,ধৈঞ্চা ইত্যাদি) শিকড়ে তুলনামূলকভাবে বেশি নাইট্রোজেন গুটি(নডিউল) তৈরি হয় এবং ৭৫-১৫০% এবং অন্যান্য ডাল ও শীম জাতীয় শস্যে বৃষ্টিকে ২০-৪৫% বেশি ফলন পাওয়া যায়। উদ্ভাবিত জীবানুসার গুলো হচ্ছে: বিনা এলটি ১৮- মসুর চাষের জন্য রাইজোবিয়াম জীবানুসারটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। জীবানু সার প্রায়োগ করে মসুর বীজের উৎপাদন ১৫-৪০% বৃদ্ধি পায়। বিনা সিপি-২ – এ জীবানুসারটি ছোলা চাষের জন্য তৈরি করা হয়েছে। যা ছোলার উৎপাদন ১৫-৪০% বাড়াতে পারে।

বিনা এমবি-১ – এটি একটি ব্রাডিরাইজোবিয়াম ইনোকুল্যান্ট, যা মুগ ডাল চাষে ব্যবহার করা হয়। এটির ব্যবহারে মুগের ফলন ১৮-৩০% বৃদ্ধি পায়। বিনা সিওপি-৭ – বরবটি চাষের জন্য এই ইনোকুল্যান্টিটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর ব্যবহার চীনাবাদামের ফলন ১৮-৩০% বৃদ্ধি লাভ করে। বিনা এসবি-৪ – সয়াবিন চাষের জন্য শক্তিশালী ব্রাডিরাইজোবিয়াম ইনোকুল্যান্টটি উদ্ভাবন করা হয়েছে।

চাষীরা এ জীবানু সার ব্যবহার করে সয়াবিনের ৭৫-১৫০% বেশি পেতে পারেন। বিনা বিজি-১ – মাষকলাই চাষের জন্য জীবানু সার উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং এটি মাষকলাইয়ের ফলন ১৮-৩০% বৃদ্ধি করতে পারে। বিনা ডিসি-৯ – জীবানু সার তৈরি করা হয়েছে ধৈঞ্চা চাষের জন্য।

এটি ব্যবহারে ফসলের বীজের ফলন ১৫-৪০% বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। বিনা জীবানু সার-১০ – এই জীবানু সারটি তৈরি করা হয়েছে ডাল ফসল ফেলন চাষের জন্য। এ সার ব্যবহারে ফেলনের বীজের ফলন ১৫-২৫% এবং সবজি (সবুজ ফল) এর ফলন ১৪-২৪% বৃদ্ধি পায়। জীবানু সার ব্যবহারের ফলে শস্যের গুণগতমান ও জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।

জীবানু সারের প্রয়োগমাত্রা: এ সারের পরিমান বিভিন্ন শস্যের জন্য বিভিন্ন রকম । মুগ,মসুর,মাষ,ধৈঞ্চা ইত্যাদি ছোট আকারে বীজে প্রতি কেজিতে ৫০ গ্রাম এবং ছোলা,মটর,সয়াবিন,বরবটি,চীনাবাদাম ইত্যাদি বড় আকারের বীজে প্রতি কেজিতে ৩০ গ্রাম জীবানু সার নিয়ম অনুযায়ী মিশিয়ে বপন করতে হয়। জীবানু সার ব্যবহারে সতর্কতা: জীবানু সার উৎপাদনের পর থেকে শুরু করে মাঠে ব্যবহারের পূর্ব পর্যন্ত পিট মাটির ভিতর যেন নির্দিষ্ট সংখ্যায় জীবানুগুলো জীবিত থাকে। কারান জীকিত জীবানুগুলো পরবর্তী সময়ে নাইট্রোজেনের গুটি তৈরি করবে।

জীবানুুগুলো কোনভাকে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা মারা গেলে এ সার ব্যবহারে ফলন বা মাটির কোন ক্ষতি না হলেও বাড়তি কোন লাভ আশা করা যায় না। জীবানু সার ব্যবহারের নিয়মাবলী: সুস্থ,সতেজ ও শুকনা বীজে পরিমাণমত চিটাগুড় মিশিয়ে নিতে হবে যাতে বীজগুলো আঠালো হয়। চিটাগুড়ের অভাবে ভাতের ঠান্ডা মার বা পানি ব্যবহার করা হয়।

* আঠালো বীজগুলোর সাথে জীবানু সার ঢেলে ভালভাবে মিশিয়ে নিতে হবে যাতে প্রতিটি বীজের গায়ে একটি কালো প্রলেপ পড়ে।

* কালো প্রলেপযুক্ত বীজ ছায়ায় সামান্য শুকিয়ে নিতে হবে যাতে বীজগুলো গায়ে গায়ে লেগে থাকে। বেশি শুকালে জীবানু সারের কার্যকারিতা কমে যায় ।

* জীবানু সার মিশ্রিত বীজে রৌদ্রহীন বা খুব অল্প রোদ্রে বপন করে বীজগুলো মাটি দিয়ে তাড়াতাড়ি ঢেকে দিতে হবে।

* কীটনাশক মিশ্রিত বীজে জীবানু সার ব্যবহার গ্রহনযোগ্য নয়, তবে বীজগুলোকে ভালোভাবে ধুয়ে ও রোদ্রে শুকিয়ে জীবানু সার ব্যবহার করা যায় ।

* ঠান্ডা, শুষ্ক ও রোদমুক্ত জায়গায় জীবানু সার ও জীবানু সার মিশ্রিত বীজ রাখতে হয়।

* জীবানু সার উৎপাদনের ১৮০ দিনের মধ্যেই ব্যবহার করা উত্তম।