| |

Ad

‘সরাসরি নিয়োজিত’ সংজ্ঞার অস্পষ্টতায় প্রণোদনায় দেরি!

আপডেটঃ 10:02 am | November 02, 2020

 

করোনা মহামারির সময়ে সম্মুখ সারির যোদ্ধা বলা হয় করোনা রোগীদের সেবা দেওয়া চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীকে। তাদের উৎসাহ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেন প্রায় সাত মাস আগে। তবে সাত মাস পরেও চিকিৎসকসহ অন্যরা এ টাকা পাননি। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে ‘সরাসরি নিয়োজিত’ কর্মীরা প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য হবেন। তবে এই সরাসরি নিয়োজিত হিসেবে কাদের সংজ্ঞায়িত করা হবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকায় প্রণোদনার টাকা পাননি সম্মুখ সারির যোদ্ধারা।

৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৮৫৩ জন চিকিৎসক, এক হাজার ৯৬৮ জন নার্স ও তিন হাজার ২৭১ জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী
এদিকে, চিকিৎসকরা বলছেন, মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯ চিকিৎসায় ‘সরাসরি জড়িত’ বলতে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীকে ব্যাখ্যা করেছে। আর সেটা যদি করা হয়, তাহলে অনেক হাসপাতালের সম্মুখ সারির যোদ্ধারা এ প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই এসব বিষয় আরও সুনির্দিষ্ট করে বিবেচনা করা দরকার। কিন্তু তার জন্য দীর্ঘ সাত মাস বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখা অপমানজনক এবং একইসঙ্গে দুঃখজনক। করোনাকালে অন্যান্য বিষয়ের মতো এ বিষয়েও মন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতার পরিচয় দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৭ এপ্রিল এক ভিডিও কনফারেন্সে বলেছিলেন, ‘মার্চ মাস থেকে যারা কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করছেন, আমি তাদের পুরস্কৃত করতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘সরকার তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেবে। এছাড়া দায়িত্ব পালনের সময় কেউ কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে, তাদের জন্য ৫-১০ লাখ টাকার একটি স্বাস্থ্যবিমা থাকবে। কেউ মারা গেলে স্বাস্থ্যবিমার পরিমাণ পাঁচগুণ বেশি হবে।’

‘তবে মনে রাখবেন, এগুলো মার্চ মাসের পর থেকে যারা জীবন বাজি রেখে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে কাজ করছেন, তাদের জন্য প্রযোজ্য হবে’, উল্লেখ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

চিকিৎসকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) হিসাব অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৮৫৩ জন চিকিৎসক, এক হাজার ৯৬৮ জন নার্স ও তিন হাজার ২৭১ জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।

এর মধ্যে মারা গেছেন ১০৩ জন চিকিৎসক। অক্টোবরেই মারা গেছেন আট চিকিৎসক।

জানা যায়, গত ৯ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগের যুগ্মসচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফের সই করা ‘করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবায় সরাসরি নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের এককালীন বিশেষ সম্মানী’ শীর্ষক পরিপত্রে বলা হয়, ‘করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদানে সরাসরি নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সরকার এককালীন বিশেষ সম্মানী দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’

পরিপত্রে আরও বলা হয়, ‘বিশেষ সম্মানীর আওতায় শুধুমাত্র করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদানে সরাসরি কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এককালীন দুই মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন।’

এর আগে, গত ১৭ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক চিঠিতে বলা হয়, করোনার চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন। আর সেজন্য অধিদফতর থেকে সেদিন থেকে তিন দিনের ভেতরে করোনা রোগীদের সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যদের নাম পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়।

গত ২২ জুলাই নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতর থেকে অতীব জরুরি লেখা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘করোনা পরিস্থিতিতে দায়িত্বপালনরত নার্সদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত নার্সদের নাম, করোনায় আক্রান্ত ও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের (নার্স) নামের তালিকা পাঠাতে হবে।’

সিলেটের করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে কাজ করা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা মুখে মুখে প্রণোদনার টাকা পাচ্ছি, অনেকটা ঘ্রাণে অর্ধভোজনের মতো অবস্থা।’

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অথবা বিভাগ থেকে আক্রান্ত বা মৃত্যুবরণকারীরা এই অর্থ পাবেন আর অর্থ দেওয়া হবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ করা করোনা সংক্রান্ত স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্ষতিপূরণ খাত থেকে। আর এজন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে। ৮০০ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে আগামী অর্থবছরের বাজেটেও একই কারণে।

চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রণোদনাতে কেন দেরি হচ্ছে, জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অদিধফতরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরাসরি বা সম্মুখ যোদ্ধা বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতা থাকায় এর বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের যে চিঠি, তাতে বলা হয়েছে যারা সরাসরি রোগীর চিকিৎসা সেবায় জড়িত সে সমস্ত চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। তবে এটা বলতে কেবলমাত্র ডেডিকেটেড হাসপাতালে যারা কাজ করেছেন তাদেরকে মিন করা হয়েছে। কিন্তু রোগীর সংস্পর্শে থেকে কাজ করেছেন, এমন অনেকেই আছেন, যারা ডেডিকেটেড হাসপাতালের বাইরে কাজ করেছেন।’

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যেমন—গ্রাম পর্যায়ে, উপজেলা পর্যায়ে, যারা নমুনা সংগ্রহ করেছেন, যারা মাঠ পর্যায় থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, দেশের পরীক্ষাগারগুলোতে যারা কাজ করছেন, যারা অ্যাম্বুলেন্সে রোগী বহন করেছেন–তারাও কিন্তু সমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিলেন। তাদের অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন। এ বিষয়টি চিঠিতে স্পষ্ট হয়নি। যদিও সব জায়গাতে বলা হয়েছিল, তথ্যগুলো দেওয়ার জন্য, আবেদন পেয়েছি, সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।

তবে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি যে, এটা কি শুধুমাত্র ডেডিকেটেড হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি যারা ওই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত ছিলেন, তারাও এতে অন্তর্ভুক্ত হবেন। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য, নজরে আনার জন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেবে অধিদফতর।

চিঠিতে ডেডিকেটেড হাসপাতাল বলে উল্লেখ করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমাম বলেন, চিঠিতে সরাসরি ডেডিকেটেড হাসপাতালের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বলা হয়েছিল রোগীর সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন। তবে যখন মৌখিকভাবে কথা হয়েছিল, তখন বলা হয়েছিল ডেডিকেটেড হাসপাতাল।

তবে ইতোমধ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে লিস্ট এসেছে, যারা সংক্রমিত হয়েছিল এবং তাদের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। একটি ত্রুটিমুক্ত তালিকা পেলেই সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন দিয়ে পুরো দেশের মানুষকে জানালো করোনায় কাজ করা চিকিৎসকসহ অন্যরা প্রণোদনা পাবেন, কিন্তু সেটা নিয়ে এখন তালবাহনা চলছে, এমন মন্তব্য বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়শনের (বিএমএ) দফতর সম্পাদক ডা. মোহা. শেখ শহীদ উল্লাহর।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, এটা আমাদের জন্য অসম্মানের, তারা বলেও সেটা দিচ্ছে না। কিন্তু প্রণোদনা না দিলেও আমরা কাজ করতে বাধ্য। কারণ সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা সরকারি কর্মচারী। চিকিৎসা দেবে বলেই তারা এ পেশায় এসেছেন।

তিনি বলেন, করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে কাজ করতে গিয়ে যত চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন নন-ডেডিকেটেড হাসপাতালে। করোনার শুরুর দিকে সমন্বয়হীনতা থাকলেও এখন সেটা অনেকটা কাটিয়ে ওঠা গেছে। কিন্তু চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর প্রণোদনার বিষয়টি ঝুলে থাকা আগের সমন্বয়হীনতার প্রতিফলন।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সচিব আব্দুল মান্নান বলেন, কাজ চলছে। সময় লাগলেও এটা হবে। আশাহত হওয়ার কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।