| |

Ad

ধর্ষকের পরিচয়ে যুক্ত হোক ‘সেক্স অফেন্ডার’

আপডেটঃ 9:22 am | November 01, 2020

 

ধরুন আপনি চাকরিদাতা। ইন্টারভিউ নিচ্ছেন রনি নামের তুখোড় এক প্রার্থীর। ডিগ্রি থেকে বাচনভঙ্গি, সবই চটকদার। চটজলদি উত্তরও দিয়ে দিচ্ছেন প্যাঁচালো সব প্রশ্নের। বোর্ডের বাকিরা মুগ্ধ। কী মনে করে চোখ বুলোলেন তার পুলিশ রেকর্ড ও এনআইডি কার্ডের বিশেষ ডাটাবেজ সেকশনে। সেখানেই চোখ আটকে গেল। বছর দশেক আগে চাকরিপ্রার্থী জনাব রনির বিরুদ্ধে তার এক সহপাঠী নারী শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছিলেন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় রনিকে সাময়িক বহিষ্কারও করা হয়েছিল। তার আইডির অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে এক পাশে লাল অক্ষরে লেখা ‘সেক্স অফেন্ডার’। তো রনিকে চাকরিটা দেবেন?

১৯ বছর বয়সী এক তরুণীকে ধর্ষণের দায়ে ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের আদালতে ১৫ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এক বাংলাদেশি। ধর্ষণের ঘটনাটি ২০১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির। ওই অভিযুক্ত জামিনে থাকা অবস্থায় যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে জার্মানি গিয়ে অ্যাসাইলাম আবেদন করলে খবর পেয়ে যায় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। তাকে জার্মানি থেকে ফেরত এনে সাজা নিশ্চিত করা হয়। সরকারি কৌঁসুলি রিচার্ড থ্যাচার বলেন, সাজা ভোগের পর তাকে বাংলাদেশে বিতাড়ন করা হতে পারে। আর যুক্তরাজ্যে থাকলে তাকে বাকি জীবন ‘যৌন অপরাধী নিবন্ধন’ (সেক্স অফেন্ডার রেজিস্ট্রার) অফিসে নিয়মিত হাজিরা দিতে হবে। বাংলাদেশে এলেও কি তাই হতো? আমাদের কি এমন অফেন্ডার রেজিস্ট্রার আছে? যেখানে নিয়মিত হাজিরা দিতে হবে? মোটাদাগে, এই শাস্তি ভোগের পর কি কাউকে আলাদা করে যৌন-অপরাধী বলে চেনার সুযোগ আছে?

বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলা যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মতো অপরাধ ঠেকাতে এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের যৌন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে নিবন্ধন করা জরুরি বলে মনে করছেন অধিকারকর্মী ও নারীনেত্রীরা। তারা বলছেন, পরিচয়পত্রের বিবরণে ধর্ষকের নিপীড়নের বিষয়টি যদি উল্লেখ থাকে, তাহলে যে কেউ এ ধরনের অপরাধ ঘটানোর আগে দশবার ভাববে। সারাজীবনের জন্য চিহ্নিতকরণের ভয়ে অপরাধের ধারে কাছেও যাওয়ার সাহস পাবে না। তবে এজন্য নারী নির্যাতন মামলা দ্রুত নিস্পত্তি ও ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তার হিসাব বলছে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা, বিশেষ করে ধর্ষণ, হত্যা, যৌন নিপীড়ন ও পারিবারিক নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ৯ মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৭৫ জন। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার ৭৬২ আর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ২০৮ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার ৪৩ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন নারী। আর ১৬১ জন নারী হয়েছেন যৌন হয়রানির শিকার। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিন জন নারী ও ৯ জন পুরুষ নিহত হয়েছেন।

উই ক্যান-এর নির্বাহী সমন্বয়ক জিনাত আরা হক মনে করেন, এ ধরনের উদ্যোগ একই ব্যক্তির একাধিকবার একই অপরাধ করার প্রবণতা কমাবে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়নের সঙ্গে যারা জড়িয়ে যান তারা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। কিছু হবে না মনে করেই তারা এটা করতে চায়। ফলে যিনি এরকম অপরাধী তার নিবন্ধন যদি পুলিশের কাছে থাকে তাহলে একই ব্যক্তির দু’দফা অপরাধের প্রবণতা কমবে। আবার এরকম অপরাধীদের ‘সেক্স অফেন্ডার’ ক্যাটাগরিতে ফেললে তারা চাকরি পাওয়া থেকে শুরু করে বাসা ভাড়া নিতেও হিমশিম খাবে।

অবশ্য বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি। কেননা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর মাধ্যমেই এর অপব্যবহার হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়।

একজন ধর্ষককে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে এবং আইডি বা সেক্স অফেন্ডার চিহ্নিত করে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা গেলে সেটা উপকারে আসবে উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ট্রাভেল করতে, হোটেলে দিন যাপনের ক্ষেত্রে, চাকরির আবেদনে অর্থাৎ যে সব জায়গায় পরিচয়পত্র দেখাতে হয় সেখানে যদি তার অতীত অপরাধ চিহ্নিত থাকে তাহলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। একজন ধর্ষক সমাজে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের সুযোগ পাবে। তবে সেক্স অফেন্ডার চিহ্নিত হওয়ার পর নির্ধারিত অফিস বা সমাজসেবা অফিসে ধর্ষক বা যৌন নিপীড়কের হাজিরা দেওয়ার বিষয়টি বেশি জরুরি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এই ধরনের অপরাধীকে নিয়মিত কোথাও হাজিরা দিতে বলা হলে, সেটা বেশি কার্যকর হবে। যে ব্যক্তি অপরাধী সে পরবর্তী অপরাধের আগে সতর্ক হবে। আবার সমাজের কাছেও সে হবে চিহ্নিত।

রাষ্ট্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত হলে জাতীয় পরিচয়পত্রে অপরাধীদের সেক্স অফেন্ডার পরিচয় সংযুক্ত করা কঠিন কিছু না উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র উইং-এর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ ধরনের কাজে যার জড়িত, তাদের জাতীয়ভাবে আমরা ঘৃণা করি। এটা প্রতিরোধ করতে সমন্বিত প্রয়াস দরকার। সবদিক থেকে একত্রিত হলে এটা প্রতিরোধ সম্ভব। যদি তাদের অপরাধের বিষয়টি নিবন্ধনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে সেটা কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব সেটি নিয়ে আমরা কাজ করতে পারি। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হবে আগে। কার্যকর করতে গেলে খুব বেশি ঝামেলা হবে না। একটা ঘর যুক্ত করে দিলেই হবে। যেখানে লেখা থাকবে সে যৌন হয়রানিমূলক অপরাধে যুক্ত ছিল। এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হলে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।