| |

Ad

অবৈধ বিদেশিদের ফেরত পাঠাতে যত জটিলতা

আপডেটঃ 5:04 am | November 01, 2020

দেশে অবৈধ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা কত, এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানা নেই কারও। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, দেশে অবৈধ বিদেশির সংখ্যা ১৩ হাজারের কিছু বেশি হবে। পুলিশের বিশেষ শাখার সংশ্লিষ্টরাও এ বিষয়ে কোনও তথ্য দিতে অপারগতা জানান। এই অবৈধ বিদেশিরা সবাই ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও তারা আর তা নবায়ন করেননি। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তারা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ ছেড়েও যাননি। এতে বিপাকে আছেন সংশ্লিষ্টরা। করোনা পরিস্থিতির আগে এই সংখ্যা ছিল ১১ হাজারের মতো। করোনা পরিস্থিতির পর এই সংখ্যা ১৩ হাজার ছাড়িয়েছে। এসব অবৈধ বিদেশির অবস্থান চিহ্নিত করে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু সেটিও বেশি দূর এগোতে পারেনি করোনা পরিস্থিতির কারণে। তাছাড়া তাদেরকে মামলা দিয়ে আটকে রাখলে আরও জটিলতা বাড়বে। এসব অবৈধ বিদেশির জন্য এয়ারপোর্ট কেন্দ্রিক কিংবা অন্য কোনও স্থানে আলাদা একটি ডিটেনশন সেন্টার করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, এমন অবৈধ বিদেশির সংখ্যা ১৩ হাজারের কিছু বেশি হতে পারে। এর বাইরে আর কোনও অবৈধ বিদেশি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন কিনা, সেই তথ্য তাদের কাছে নেই। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যারা অবৈধ হয়েছেন, তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ করছে মন্ত্রণালয়। তবে এখন পর্যন্ত কত জনকে ফেরত পাঠানো গেছে, সেই তথ্যও জানাতে চাননি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। করোনা মহামারির আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, বাংলাদেশে অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশি কর্মীর সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, যারা অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, তাদের বেশিরভাগই পর্যটন, স্টুডেন্ট ও বিভিন্ন ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে এসেছিলেন। এরপর তারা নানা প্রতারণার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন সময় আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেফতারও করেছেন। তারা বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার আশ্বাস ও চাকরির প্রলোভনসহ নানা প্রতারণা করে বেড়ান। অস্ত্র, সোনা ও মাদক চোরাচালান, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, বিভিন্ন দেশের জাল নোট তৈরি, ডলার জালিয়াতিসহ নানা অপরাধেও তারা জড়িয়ে আছেন। অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকা অবস্থায় গ্রেফতার হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু যারা ধরা পড়েন না তাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপও নেওয়া যায় না। ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, লিবিয়া, চীন, আফ্রিকা, ঘানা, নাইজেরিয়া ও কঙ্গোসহ ১৫ থেকে ২০টি দেশের নাগরিকরা রয়েছেন অবৈধের তালিকায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, করোনা পরিস্থিতির আগেই আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অবৈধ বিদেশিদের অবস্থান চিহ্নিত করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর অবৈধ বিদেশিদের চিহ্নিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা ইউনিট ও সংস্থাগুলো কাজ শুরু করে। দেখা গেছে, কিছু দেশের দূতাবাসও বাংলাদেশে নেই। তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টিও তাই জটিলতায় রয়েছে। তাদের ফেরত পাঠাতে হলে সরকারের খরচেই ফেরত পাঠাতে হয়। ফলে অর্থ বরাদ্দের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। অবৈধ বিদেশি বন্দিদের মধ্যে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হয়ে কারাগারে আছেন প্রায় সাতশ’ বন্দি। এরমধ্যে বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে আছেন ৬৫ জন। সাজা শেষ হয়ে গেছে এমন বন্দি আছেন ৮২ জন। যাদের কারা কর্তৃপক্ষের ভাষায় বলা হয় ‘রিলিজ প্রিজনার’ (আরপি)। নানা জটিলতায় তাদেরকেও নিজ নিজ দেশে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এসব রিলিজ প্রিজনারের কারও কারও দেশের দূতাবাস ও হাই কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কাছ থেকে তেমন কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে তারা বছরের পর বছর কারাগারেই থাকছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহিদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অবৈধ বিদেশিদের অবস্থান চিহ্নিত করে, তাদের নিজ নিজ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এরইমধ্যে কিছু সংখ্যক অবৈধ বিদেশিকে পাঠানোও হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত রয়েছে। তাদের ফেরত পাঠানোর সেই প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। কয়েকজনকে ফেরতও পাঠানো হয়েছে।’

সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহিদুজ্জামান আরও বলেন, ‘বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের এখানে কোনও ডিটেনশন সেন্টার নেই। তাদের জেলখানায়ও রাখা যায় না। সেখানে রাখলে তো মামলা দিতে হয়। মামলা দিলে আমাদেরই ক্ষতি। এতে তাদের পেছনে আমাদের আরও ব্যয় হবে। এজন্য একটা ডিটেনশন সেন্টার দরকার। সেটা এয়ারপোর্ট কেন্দ্রিক হোক, আর যেখানেই হোক। তখন সেই ডিটেনশন সেন্টারে রেখে তাদের দেশে পাঠানো সহজ হতো।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ভিসা নিয়ে অনেকেই বৈধভাবেই বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও তারা নিজ দেশে ফেরত যাননি। ভিসার মেয়াদও নবায়ন করেননি। তাদের পাসপোর্ট ও ভিসার মেয়াদ কোনোটিই নেই। তাই সরকার নিজ উদ্যোগে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে।’